Logo

মগবাজারে নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ধসে পথচারীর মৃত্যু

মগবাজারে নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ধসে পথচারীর মৃত্যু

রাজধানীর ঘিঞ্জি এলাকায় অপরিকল্পিত ও অসতর্কভাবে নির্মাণকাজ পরিচালনার মাসুল দিতে হলো আরও একটি তাজা প্রাণকে। মগবাজারের মধুবাগ এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের দেয়াল ধসে রাশেদা বেগম (৩৮) নামের এক শ্রমজীবী নারী নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, ঢাকা শহরের পথচারীদের নিরাপত্তা এখন কতটা ঠুনকো।


রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগ ৩ নম্বর গলি। শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাত তখন সাড়ে আটটা। কর্মব্যস্ত দিন শেষে বাড়ি ফিরছিলেন রাশেদা বেগম। তিনি পেশায় ছিলেন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে সহায়তাকারী বা গৃহকর্মী। প্রতিদিনের মতোই তিনি গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নির্মাণাধীন একটি ভবনের পাশের পথটি ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু নিয়তি তাকে সেই গন্তব্যে পৌঁছাতে দেয়নি। হঠাৎ কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই ভবনটির একটি অস্থায়ী দেয়াল হুড়মুড় করে তার ওপর ভেঙে পড়ে।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত রাশেদাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেয়ালটি সরাসরি রাশেদার গায়ের ওপর পড়লে তিনি গুরুতর জখম হন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। রাত ১০টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে পৌঁছালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত রাশেদা বেগমের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে। তার স্বামীর নাম সাইফুল ইসলাম। তারা দীর্ঘ দিন ধরে মধুবাগ ৩ নম্বর গলির রুহুল আমিনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করে আসছিলেন। রাজধানীতে শ্রম বিক্রি করে পরিবারের চাকা সচল রাখতে লড়াই করছিলেন এই নারী, কিন্তু নির্মাণাধীন ভবনের অবহেলা সেই লড়াই থামিয়ে দিল চিরতরে।

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বরত কর্মকর্তা (পরিদর্শক) মো. ফারুক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, যথাযথ নিরাপত্তা বেষ্টনী (সেফটি নেট) বা মজবুত কাঠামো ছাড়াই ভবনটির নির্মাণকাজ চলছিল, যার ফলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

 

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে হাজার হাজার ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় পথচারীদের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চারিদিকে শক্ত বেষ্টনী দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে মগবাজারের এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেখানে কোনো কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, অনেক সময় ভবনের মালিকপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এসব এলাকা দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হয়।

 

রাশেদা বেগমের এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি স্পষ্টত গাফিলতির ফল। আমাদের উন্নয়ন যখন সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে দামী হয়ে ওঠে, তখন রাশেদাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। একটি ভবন নির্মাণের সময় সামান্য সতর্কতা এবং নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করলে হয়তো এই পরিবারটি আজ তাদের প্রিয়জনকে হারাতো না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন এসব নির্মাণাধীন সাইটে নিয়মিত তদারকি (মনিটরিং) করছে না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল ক্ষতিপূরণ বা শোকবার্তা দিয়ে এ ধরনের লাশের মিছিল থামানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ভবন মালিক ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কঠোর জবাবদিহিতা। আজ যদি আমরা এই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হই, তবে কাল হয়তো অন্য কোনো রাশেদাকে এই একই পরিণতির শিকার হতে হবে। আমাদের নগরায়ন কি তবে জীবনের বিনিময়েই হবে?

খবরের এলাকা: ঢাকা ঢাকা ঢাকা দক্ষিণ
জাতীয়

মগবাজারে নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ধসে পথচারীর মৃত্যু

R
Roksana | 13 March 2026
বিস্তারিত পড়ুন
www.bartanext.com

নেভিগেশন মেনু

প্রচ্ছদ